খালেদা জিয়াকে বিদেশ যেতে না দিলে ঢাকা অচল করে দেওয়া হবেঃফকরুল ইসলাম

1143

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি না দেয়া নিয়ে ‘খোঁড়া যুক্তি’ না দিয়ে বরং সোজাসাপ্টা কথা বলার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন, ‘কেন এ সমস্ত খোঁড়া যুক্তি? তারচেয়ে সোজা বলেন যে, ‘আমরা তাঁকে বিদেশে যেতে দেবো না’।’

এ নিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘সেই বলার মতো তো বদান্যতা আপনাদের নাই, সেই বড় হৃদয় আপনাদের নাই। শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের এটা ছিলো। উনিও তাঁর অনেক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে এসমস্ত সুবিধা দিয়েছেন। ছেড়ে দিয়েছেন, মুক্তি দিয়েছেন এবং তাদেরকে হেলপও করেছেন। কিন্তু আপনাদের সেই বড় হৃদয় নাই। থাকলে বেগম খালেদা জিয়াকে অনেকদিন আগেই আপনারা ছেড়ে দিতেন, রাজনীতি করতে দিতেন।’

খালেদা জিয়া সম্পর্কে ‘যাচ্ছে তাই কথা’ বলে সরকার পার পাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে মির্জা ফখরুল ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘যেসব কথা বলা হচ্ছে এখন এগুলো শুধু অশালীন নয়, অমার্জিত এবং অগ্রহণযোগ্য। আমি আবারও বলছি, দয়া করে সংযত হোন, দয়া করে আপনাদের কথা- এটা একটু কমান।’

দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সম্পর্কে সরকারের কিছু প্রভাবশালী মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মঙ্গলবার (১১ মে) দুপুরে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন।

ফখরুল বলেন, ‘যাচ্ছে তাই বলবেন আর আপনারা মনে করবেন সবসময় পার পেয়ে যাবেন। এভরি থিং ইজ বিং নোটেড অ্যান্ড দি পিপলস অব দিস কান্ট্রি উড বি গিভ এনারসার টু টাইমলি। সময় যখন আসবে তারা তার জবাব দিয়ে দেবে।’

তিনি বলেন, ‘তাঁকে (খালেদা জিয়া) অন্তরীণ করে রাখা, তাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে তার দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া এটাই সরকারের লক্ষ্য।’

বিএনপি প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, ‘এদেশে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে একটি দল আছে সেটা হচ্ছে বিএনপি। জনগণের রাজনীতি একটামাত্র দল ধারণ করে সেটা হচ্ছে বিএনপি। অর্থাৎ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশের অন্তরাত্মার সেই রাজনীতি করে বিএনপি। এই দলের মূল শক্তি জনগণ। বিএনপির ভোটাররা যারা বাংলাদেশি, যারা বাংলাদেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম দেখতে চায়, শতকরা এক‘শ জন মানুষের যে মূলবোধ, ধর্মীয়বোধ, চিন্তাবোধ ধারণ করে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বিএনপি কাজ করে।’

খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকার ঘোষিত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘উনারা বলেছেন, অনুমতি দিতে পারছেন না। না পারার যে যুক্তিগুলো দিলেন, সেই যুক্তিগুলো একেবারেই অগ্রহযোগ্য, খোঁড়া যুক্তি। তারা বলেছেন যে, সাজাপ্রাপ্তদের বিদেশে পাঠানোর নজির নেই। এটা তারা ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন, জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন।’

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘১৯৭৯ সালে আমাদের প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী আ স ম আবদুর রব জেলে ছিলেন। তখন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেব তাকে এই আইনে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য জার্মানি পাঠানোর অনুমতি দিয়েছিলেন। এরপরে আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন এম মনসুর আলী সাহেবের ছেলে মোহাম্মদ নাসিম সাহেব, ২০০৮ সালে বর্তমান সরকারের সাজাপ্রাপ্ত সেই নাসিম সাহেবকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছিলো। এরপর আমি আর নাম বলব না, দুই সহোদর ভাই অত্যন্ত উচ্চপদস্ত প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তার ভাই, তারা কিন্তু এই ৪০১ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, তাদেরকেও মাফ করে দিয়ে বাইরে পাঠানো হয়েছিলো। সুতরাং কেন এই সমস্ত খোঁড়া যুক্তি? তারচেয়ে সোজা বলেন যে, আমরা দেবো না।’

সরকারের প্রতি প্রশ্ন রেখে ফখরুল বলেন, ‘এতো ভয় কেনো? নির্বাচন করবেন না, নির্বাচন ছাড়া আপনারা জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসবেন। কারণ আপনারা জানেন যে, নির্বাচন হলে আপনারা কোনো দিনই জিততে পারবেন না।’

‘আপনারা (সরকার) কীসের গণতন্ত্রের কথা বলেন, কীসের নৈতিকতার কথা বলেন, কীসের ইথিক্সের কথা বলেন- আমরা আজ পর্যন্ত বুঝতে পারি না। সত্যি কথা বলতে কি- আওয়ামী লীগ এটা বিশ্বাসই করে না। যখনই তারা ক্ষমতায় এসছে, তখনই তারা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য যা যা করা দরকার তা করেছে। ইনফেক্ট দে উসট্রয় বাংলাদেশ, আমি আগেও বলেছি তারা বাংলাদেশের সোলটাকে (আত্মা) মেরে ফেলেছে, ধ্বংস করে ফেলেছে।’

তিনি বলেন, ‘তাদের (সরকার) এই আচরণ ম্যাডামকে (খালেদা জিয়া) বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য যেতে না দেয়ার বিষয়টা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক, অমানবিক এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করা। আমরা এর তীব্র নিন্দা তখনও জানিয়েছি, এখনও জানাচ্ছি।’

‘আমরা কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে যাওয়ার জন্য আবেদনটা করি নাই। আবেদটা করেছেন পরিবার। ইনস ভেরি লাইটলি এন্ড জেন্যুইন। তারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয় যারা আবেদনটা করেছেন। সেখানে সবাই এসপেক্ট করেছিলো এবংকি বিদেশীরা পর্যন্ত তাকে চিকিতসার জন্য বাইরে যেতে সুযোগ দেয়া হবে। সেটা তারা দেয় নাই’- বলেন বিএনপি মহাসচিব।

খালেদা জিয়া সম্পর্কে সরকারের কিছু মন্ত্রীর ‘বিদ্রুপাত্মক’ মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এসব মন্ত্রী যারা ওইভাবে ক্ষমতায় না আসলে কোনোদিন এমপি হওয়ারও স্বপ্ন দেখতে পারতো না। তারা আজকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে যে ধরনের উক্তি করছেন তা থেকে বিরত থাকবেন। ভবিষ্যতে এই ধরনের উক্তি করলে তার যথাযোগ্য জবাব এদেশের জনগণ আপনাদেরকে দেবে।’

‘পুঁজিবাদীদের পক্ষে সরকার’ মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনারা শুধুমাত্র কিছু পুঁজিবাদীদের স্বার্থে, কিছু লুটপাটকারীদের স্বার্থে পুলিশ দিয়ে শ্রমিকদের হত্যা করছেন। বাঁশখালীতে যে ঘটনা ঘটেছে এটা তো কিছু পুঁজিবাদীর স্বার্থে সম্পূর্ণ শ্রমিকদের হত্যা করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘শ্রমিকরা ফান্ডামেন্টালিজ করে নাই। তারা তাদের বকেয়া বেতন চেয়েছিলো, তারা ছুটি বাড়িয়ে চেয়েছিলো। গতকাল টঙ্গিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ওপর গুলি চালিয়েছিলো। কেনো? আলোচনা করেন, কথা বলে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে বন্দুক বের করে গুলি করলেন?… কেউই নিরাপদ নয় আজকে।’

লকডাউনে বিএনপি নেত্রী নিপুণ রায় চৌধুরীসহ নেতাকর্মী এবং আলেম-উলামাসহ বিরোধী দলের আটক রাজবন্দি যেসব নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছে ঈদের আগেই তাদের সবার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান বিএনপি মহাসচিব।

প্রণোদনা কোথায় দিচ্ছেন- সরকারের প্রতি এমন প্রশ্ন রেখে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বার বার করে বলেছেন যে, প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে, আওয়ামী লীগ বলছে। কিন্তু কোথায় প্রণোদনা দিচ্ছেন? এই যে লক্ষ কোটি মানুষ আমাদের অর্থনীতিবিদদের যে হিসাবে ৬ কোটি মানুষ ইনফরমাল সেক্টরে কাজ করছে, তাদের ৮০% বেকার। তাদের কোনও আয় নাই।’

‘আমরা বলেছিলাম যে, এদের কাছে কেস টাকাটা পৌঁছানো। এটা খুব কঠিন কাজ না। প্রত্যেকের এনআইডি কার্ড আছে, সেখানে আপনি ব্যবস্থা করে টাকাটা পৌঁছানো যায়। আপনি ১০/১৯ কোটি টাকা দিয়ে বলছেন, দিয়েছি। কেনো আপনি ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ করছেন না তাদের জন্য। কেনো? এরাই তো মানুষ, জনসংখ্যার এক দশমাংশ’- যোগ করেন তিনি।

প্রবাসীরা দেশে ফিরে এসে ‘বেকার’ হয়ে আছে উল্লেখ করে এ ব্যাপারে তাদের জন্য সরকারের কোনও বরাদ্ধ নেই বলেও মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব।