ভারতে বাংলাদেশি তরুণীকে যৌন নির্যাতন: এবার ‘বস রাফি’ গ্রেফতার

1010

ভারতের বেঙ্গালুরুতে এক বাংলাদেশি তরুণীকে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় আশরাফুল মন্ডল ওরফে ‘বস রাফি’ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) জানিয়েছে, গ্রেফতার বস রাফি আন্তর্জাতিক নারীপাচার চক্রের অন্যতম মূল হোতা। টিকটকে মডেল করার প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে নারী পাচার করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

মঙ্গলবার (১ জুন) র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল খাইরুল ইসলাম গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
র‌্যাব জানিয়েছে, ঝিনাইদহ, যশোর ও অভয়নগরে অভিযান চালিয়ে নারীপাচার চক্রের মূল হোতা রাফিসহ এ চক্রের ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে একজন নারী রয়েছে।

এদিকে বেঙ্গালুরুতে যৌন নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি তরুণীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। কেরালা রাজ্যের কোঝিকোড়িতে গেল শুক্রবার (২৮ মে) শনাক্ত করার পর তাকে বেঙ্গালুরুতে নিয়ে যাওয়া হয়।
ওই তরুণীকে অনেক খোঁজাখুজির পর সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওর সূত্র ধরে পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করে।

ওই ভিডিওর সূত্র ধরেই গেল শুক্রবার বেঙ্গালুরুতে সেখানকার পুলিশ ঘটনার মূল হোতা রিফাতুল ইসলাম হৃদয় ওরয়ে টিকটক হৃদয়সহ ৬ জনকে গ্রেফতার করে। তাদের মধ্যে দুজন নারীও রয়েছেন। গ্রেফতার ৬ জনের মধ্যে দুই যুবক পালাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু’র এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ওই তরুণীর বয়স যখন ২০ বছর তখনই আসামিদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এর মধ্যে দুজন তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় বলে জানা গেছে।

নির্যাতনের শিকার ওই তরুণী রাজধানী ঢাকার মগবাজার এলাকার বাসিন্দা। সৌদি আরবে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন ওই তরুণী। দুবছর আগে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় তার।
তাকে উদ্ধার করা বেঙ্গালুরু পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এরই মধ্যে ওই তরুণী দুবাই গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে দেহ ব্যবসায় বাধ্য করা হয়েছিল এবং প্রায় এক বছর ধরে তিনি সেখানকার একটি পানশালায় (বার) নর্তকির কাজ করেন। কয়েক মাস আগে ওই তরুণী তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় মোহাম্মদ বাবা শেখের কথায় ভারতে আসেন। বাবা শেখ নিজেও একটি পতিতাবৃত্তি চক্রের সদস্য।

জানা যায়, বাবা শেখ ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশ থেকে আসা নারীদের ভারতে বিউটি সেলুন ও গৃহকর্মীর কাজ জুটিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে পাচার করতেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা ও কেরালায় পতিতাবৃত্তি চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগী তরুণী ওই দলের সঙ্গেই যোগ দিয়েছিলেন। এরপর তিনি কোঝিকোড়িতে গিয়ে একটি মাসাজ পার্লার খোলেন। তখন থেকেই অভিযুক্তদের সঙ্গে তার আর্থিক বিরোধের শুরু।

পুলিশ জানায়, আর্থিক কলহ মেটানোর কথা বলে ওই তরুণীকে বেঙ্গালুরুতে নিয়ে আসা হয়েছিল। তিনি একটি ঘরে ঢুকতেই অভিযুক্তরা সহিংস হয়ে ওঠে। তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়, যৌন নির্যাতন চালানো হয় এবং ফোনে ভিডিও ধারণ করা হয়।

পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি ছাড়াও অভিযুক্তদের মোবাইল থেকে আরও দুটি ভিডিও উদ্ধার করা হয়েছে। ওই তরুণীকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য ওই ভিডিওগুলো ধারণ করা হয়েছিল। অর্থ না দিলে তারা ওই ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছিল।

এমন নির্যাতনের পর ওই তরুণী পুলিশের সাহায্য না নিয়ে তার প্রেমিককে ফোন দিলে, একদিন পর ওই ঘর থেকে তরুণীকে উদ্ধার করেন প্রেমিক। এরপর তারা কোঝিকোড়িতে চলে যান। উদ্ধারের পর গত ২৮ মে রাতেই ওই তরুণীর মেডিকেল পরীক্ষা করা হয়।

তরুণীকে অপহরণ ও তার ওপর এমন বর্বরোচিত নির্যাতনের ঘটনা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরে চরম ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত তার মা, আত্মীয়-স্বজনসহ, পাড়া-প্রতিবেশী। সবাই ওই তরুণীকে দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবার দৃষ্টান্তমূলক শান্তির দাবি জানিয়েছেন।

নির্যাতিত তরুণীর মা বলেন, ‘আমার মেয়ে এতদিন কোথায় ছিল আমরা জানতাম না। আমরা মেয়েকে দ্রুত ফেরত পেতে চাই। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তির দাবি করছি। সরকারের কাছে এই আমার চাওয়া।’ ওই তরুণীর অন্য স্বজনরাও একই দাবি জানিয়েছেন।

গেল কয়েকদিন ধরে ভারতের কেরালা রাজ্যে বাংলাদেশি ওই তরুণীকে যৌন নির্যাতনের ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ তেজগাঁও বিভাগের নজরে আসে।
পুলিশ জানায়, ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, আনুমানিক ২০-২২ বছর বয়সী এক তরুণীকে বিবস্ত্র করে ৩-৪ জন যুবক অমানুষিকভাবে যৌন নির্যাতন করছে। ধারণ করা ভিডিওটির একজন নির্যাতনকারীর সঙ্গে রাজধানীর মগবাজার এলাকার একটি ছেলের ফেসবুকে পোস্ট দেয়া ছবির সঙ্গে মিলে গেলে এ নিয়ে তদন্তে নামে তেজগাঁও পুলিশ।’

পুলিশ তদন্তে নেমে জানতে পারে, নির্যাতকারী ওই যুবকের নাম রিফাতুল ইসলাম হৃদয়। সে রাজধানীর মগবাজার এলাকার বাসিন্দা। রিফাতুলের পরিচয় তার মা ও মামার কাছ থেকেও শনাক্ত করা হয়। স্থানীয় এলাকায় সে টিকটক হৃদয় নামে পরিচিত। এছাড়া মেয়েটির বাবা-মাকেও খুঁজে বের করে পুলিশ। মেয়েটির বাবা-মা পরিচয় নিশ্চিত করে পুলিশকে জানায়, তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জে। তাদের মেয়ে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকার একটি বাসায় থাকতো।

গত ২৭ মে সন্ধ্যায় মেয়েটির বাবা ডিএমপির হাতিরঝিল থানায় বাদী হয়ে নির্যাতনের ঘটনায় মানবপাচার আইন ও পর্নোগ্রাফি অ্যাক্টে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, মেয়েটির বাবা মগবাজার এলাকার ফুটপাতে ব্যবসা করেন। তার মেয়ের ৬-৭ বছর আগে বিয়ে হয়। স্বামী ৩ বছর ধরে কুয়েতে থাকে। স্বামীর বিদেশ থাকাকালে মেয়েটি বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি দুই জায়গাতেই থাকতো। ১৫ মাস আগে সে তার বাবাকে জানায়, সে দুবাই যাবে। কিন্তু বাবা তাকে নিষেধ করে। তবে এক বছর ধরে সে নিখোঁজ হয়ে যায়।

মামলার বাদী আরও জানান, পরে তিনি জানতে পারেন, মগবাজারের রিফাতুল ইসলাম ওরফে টিকটক হৃদয় তাকে ফুসলিয়ে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাচার করে। কিছুদিন আগে তিনি জানতে পারেন, তার মেয়ে হৃদয়ের সঙ্গে ভারতে আছে। তবে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ভিডিও দেখে বাদী তার মেয়েকে চিনতে পারেন। ভিডিও দেখে রিফাদুলকেও শনাক্ত করেন মেয়েটির বাবা।
এজাহারে ভিডিওতে করা নির্যাতনের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়।

এদিকে ওই তরুণীকে নির্যাতনের ঘটনায় বেঙ্গালুরুতে ধর্ষণ, নির্যাতন ও অন্যান্য অভিযোগে গ্রেফতার ৬ জনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, রিফাতুল ইসলাম হৃদয় ওরফে ‘টিকটক হৃদয় বাবু’ একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য। ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের দুবাইসহ বেশ কয়েকটি দেশে এ চক্রটি জাল বিস্তার করে আছে বলেও দাবি পুলিশের।

ওই তরুণীকে নির্যাতনের ঘটনায় গ্রেফতার ৬ জনের মধ্যে ৪ জন হলেন- সাগর, মোহাম্মদ বাবা শেখ, হৃদয় বাবু ও হাকিল। গ্রেফতার অপর দুই নারীর নাম প্রকাশ করা হয়নি।

সুত্র-চ্যানেল উগান্ডা