প্রতিদিন গড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছেন ৬০০০ মানুষ!

514

ইসলাম ডেস্ক: 9/11 এর পরে পশ্চিমারা মুসলিম দেশগুলোর উপর অন্যায়-অ’ত্যাচার শুরু করে। ইসলামের দিকে ঝুঁকছে। ১১ ই সেপ্টেম্বর প্রচারমাধ্যমকে ইসলামকে অনেক বেশি মনোযোগ দিয়েছে।

যদিও, মিডিয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুসলিম ও ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক খবর প্রকাশ করেছে, এটি মানুষকে ইসলাম সম্পর্কে গবেষণা করেছে। এর ফলে অনেকে ইসলাম সম্পর্কে সত্যকে খুঁজে পেয়েছে এবং আরও সহজেই এটিকে তাদের বিশ্বাস হিসাবে গ্রহণ করে।সম্প্রতি ইকোনমিস্টের এক জরিপে উঠে এসেছে, সেখানে দৈনিক ৬০০০ মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে।

যারা মুসলিম হয়েছেন, মুসলিম হওয়ার পর থেকে তিনি আরও শান্তিতে বোধ করেন এবং সঠিক বিশ্বাস থাকার কারণে ইসলাম তাদের জীবনকে আরও উন্নত করে তুলেছে।পবিত্র হজের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে মক্কা। জানা যায়, কাবা শরিফের কালো গিলাফ নিচ থেকে তিন মিটার ওপরে উঠিয়ে অতিরিক্ত সাদা কাপড়ে আবৃত করার মাধ্যমে শুরু হয়েছে এবারের হজের প্রাথমিক প্রস্তুতি।

এদিকে গত বুধবার (৩০ জুন) রাতে মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববির জেনারেল প্রেসিডেন্সির ড. শায়খ আব্দুর রহমান সুদাইসির তত্ত্বাবধানে ৩৭ জন কর্মকর্তা এ কাজ সম্পন্ন করেন। পবিত্র হজকে নির্বিঘ্ন করতে মক্কা, আরাফা,মুজদালিফা ও মিনায় বসানো হয়েছে ৮৭৫ লাইটিং টাওয়ার। খবর আল-আরাবিয়া ডটনেট (আরবিএ বছর হজের জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি সম্পন্ন। এখন হজের অপেক্ষা, এমনটিই জানিয়েছে মক্কায় হজ মন্ত্রণালয়ে।সকল প্রশংসা সেই সত্তার যার হাতের মুঠোতে আমার জীবন-মৃত্যু। সকল প্রশংসা তাঁরই যিনি আমাকে অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন, শুকরিয়া প্রকাশ করছি রাব্বুল আলামিনের যিনি আমার কলমকে সচল রেখেছেন। সে রবের কাছে লাখো-কোটি শুকরিয়া যিনি আমাকে মুসলিম বা মুসলমান সম্পর্কে কিছু লেখার জন্য সাহায্য করেছেন, দিয়েছেন জ্ঞান।
অসংখ্য দরুদ ও সালাম বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, মহান শিক্ষক সাইয়্যিদুল মুরসালিন হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি, যিনি আল্লাহর দীনকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। যিনি পৃথিবীর ইতিহাসে এক ঘোরতর জাহেলিয়াতের যুগে আবির্ভূত হয়ে ইসলামের দাওয়াতের মাধ্যমে জাহেলিয়াতের পংকিলতায় নিমজ্জিত জাতিকে তাওহিদি চেতনায় উদ্ভাসিত ও আলোকিত করেছেন।

ভূমিকা
বর্তমান বিশ্বে প্রায় ১৭০ কোটি মুসলিম বা মুসলমান আছে বলে আমরা একটা ধারণা পাই। আমরা স্বাভাবিকভাবেই মনে করি, শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মত, যারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী তারাই মুসলিম। তাছাড়াও বাংলা অভিধানেও মুসলিম শব্দের অর্থ তাই লিখা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা অভিধানের সেই শব্দটাই শিক্ষার্থীদের মগজে ঢুকে যায়, তা আর বের হয় না। বের হওয়ার কোনো কারণও নেই। কারণ তার কোনো বিকল্প অর্থ থাকতে পারে বা মুসলিম অর্থ অন্য কিছু হতে পারে তা ভাববার অবকাশ কই? প্রকৃত অর্থে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতেরাই শুধুমাত্র মুসলিম নয়। আদি পিতা হযরত আদম আ. ও মা হাওয়া আ. মুসলিম ছিলেন। আল্লাহ তা’আলা কুরআন করিমের একাধিক স্থানে মুসলিমের সংজ্ঞা নিয়ে এরশাদ করেছেন।
রাব্বুল আলামিন যদি তওফিক দান করেন তাহলে, আমি আমার এই নিবন্ধে মুসলিম সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেওয়ার চেষ্ঠা করবো।

মুসলিম শব্দের অর্থ
প্রশ্ন এসেছে মুসলিম বা মুসলমান শব্দের অর্থ কী?
মুসলমান বা মুসলিম শব্দের অর্থ লিখতে গিয়ে বাঙলা ভাষায় প্রচলিত বিভিন্ন অভিধানে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। বাংলা একাডেমি ও কলিকাতা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত অভিধানে মুসলিম শব্দের অর্থ কি লিখেছে তা আমরা দেখে নিতে পারি।
বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পরিমার্জিত সংস্করণ : পৌষ ১৪০৭/ ডিসেম্বর ২০০০। দ্বিতীয় সংস্করণ : অগ্রহায়ণ ১৩৯৯/ নভেম্বর ১৯৯২। পুনর্মুদ্রণ : ভাদ্র ১৪১০/ সেপ্টেম্বর ২০০৩।-এ মুসলমান, মুছলমান, মুসলিম, মোসলেম (মুসলমান-ছ-, মুসলিম, মোস্-) বি. হজরত মুহম্মদ সা. কর্তৃক প্রবর্তিত ইসলাম ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায় বা ব্যক্তি। ০ বিণ. ১. ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। ২. ইসলাম ধর্ম বা মুসলমান সম্পর্কিত।
মুসলিম বি. ১. মুসলমানদের রীতি। ২. খৎনা; সুন্নৎ; ত্বকচ্ছেদ। ৩. মুসলমান ধর্মাবলম্বিনী নারী। ০ বিণ. মুসলমানের ধর্ম সংক্রান্ত। (আ. মুসলিম, ফা. মুসলমান).।
সংসদ বাঙ্গালা অভিধান, সংশোধিত ও পরিবর্ধিত চতুর্থ সংস্করণ, সাহিত্য সংসদ, ৩২৩ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড, কলিকাতা-৯। ত্রয়োবিংশতিতম মুদ্রণ আগস্ট ১৯৯৯, পৃষ্ঠা- ৫৮৫- এ মুসলমান, মুসলিম – (১) বি. হজরত মোহাম্মদ কর্তৃক প্রবর্তিত ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায় বা ব্যক্তি। (২) বিণ. হজরত মোহাম্মদ কর্তৃক প্রবর্তিত ধর্মসম্বন্ধীয় বা ধর্মাবলম্বী। (ফা. মুসলমান, আ. মুসলিম)।
উপরের দুইটি অভিধানে মুসলিম বা মুসলমান শব্দের অর্থ যা লিখা হয়েছে তা কি আমরা মেনে নিতে পারি? এক কথায় বলা যেতে পারে, না। কারণ অভিধানে মুসলিম শব্দের অর্থ যা লিখা হয়েছে তা সঠিক নয়। অর্থাৎ বাংলা ভাষার অভিধানগুলো আমাদেরকে ভুল শিক্ষা দিয়ে এসেছে এবং এখনো তা অব্যাহত আছে। তবে বাংলা একাডেমির অভিধানের বিশেষণ-এ ১. ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী ও ২. ইসলাম ধর্ম বা মুসলমান সম্পর্কিত মুদ্রিত হয়েছে। কিন্তু বিশেষ্যতে যা মুদ্রিত হয়েছে তাতে করে আর বিশেষণে মুদ্রিত অর্থের মূল্য থাকে না। কারণ বিশেষ্যতে বলা হয়েছে “হজরত মুহম্মদ সা. কর্তৃক প্রবর্তিত ইসলাম”। এখানে যে ভুলটা করেছে তার ফলে কিছুটা শুদ্ধ লেখার চেষ্টা লক্ষ করা গেলেও তাও তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম ধর্ম শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক প্রবর্তিত নয়।
মুসলিম বা মুসলমান একই সমার্থক শব্দ। মুসলিম আরবি শব্দ আর মুসলমান ফার্সি শব্দ। মুসলিম বা মুসলমান শব্দের একই অর্থ প্রকাশ করে।

প্রকৃত পক্ষে মুসলিম শব্দের অর্থ কী?
মুসলিম শব্দের অর্থ (আরবি : مسلم) আত্বসমর্পণ, অনুগত বা একমাত্র আল্লাহ্র বন্দেগী ও আনুগত্যকারী। মুসলিম শব্দ অর্থ আরো খোলামেলা ভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, সেই লোক যে নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহ্র কাছে আত্বসমর্পণ করে।
অতএব যে নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহ্ তা’আলার কাছে আত্বসমর্পণ করে শান্তি অর্জন করেছে তাকে মুসলিম বলে। যেমন : হযরত ইববাহীম আ.-কে যখন তার পালনকর্তা বলেন আত্মসমর্পণ কর। সে বলল আমি বিশ্ব জগতের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করলাম। আল্লাহ্ তা’আলা কুরআন করিমের সুরা আল বাক্বারাহ্-এর ১৩১ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন এভাবে, “মুসলিম (অনুগত) হয়ে যাও, “তখনই সে বললো, “আমি বিশ্ব-জাহানের প্রভুর ‘মুসলিম’, (অনুগত) হয়ে গেলাম।”
পারিভাষিক অর্থে যদি বলি, যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনকে মহান প্রতিপালক হিসেবে গ্রহণ করবে, আল্লাহ্র সাথে কাউকে শরীক করবে না এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশিত পথে নিজের জীবন চালাবে, হালালকে হালাল বলে মানবে এবং হারামকে হারাম হিসেবে পরিত্যাগ করবে, সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, রোজা রাখবে, নিসাবের অধিকারী হলে যাকাত আদায় করবে এবং হজ্জে গমন করবে। এইসব গুণাবলীর অধিকারী হলে তাকে ‘মুসলিম’ বলা হয়।
কুরআন করিমের সূরা আন নামল-এর ৩১ নম্বর আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে এভাবে, “আমার অবাধ্য হয়ো না এবং মুসলিম হয়ে আমার কাছে হাজির হয়ে যাও।”
হযরত সুলায়মান আ.-এর জামানায় প্রতিবেশি সাবা রাণীকে লেখা একটি চিঠি প্রসঙ্গে রাব্বুল আলামিন এই আয়াত নাযিল করেছেন। হযরত সুলায়মান আ.কে আল্লাহ্ অর্থ-সম্পদ, রাষ্ট্র-ক্ষমতা, পরাক্রম, মর্যাদা ও গৌরব এতোবেশি দান করেছিলেন যে, মক্কার কাফেররা তা কল্পনাও করতে পারতো না। কিন্তু এতোসব সত্ত্বেও তিনি আল্লাহ্র সামনে নিজেকে জবাবদিহি করতে হবে বলে মনে করতেন এবং তাঁর মধ্যে এ অনুভূতিও ছিলো যে, তিনি যা কিছুই লাভ করেছেন সবই আল্লাহ্র দান, তাই তাঁর মাথা সবসময় প্রকৃত নিয়ামত দানকারীর সামনে নত হয়ে থাকতো এবং আত্ম-অহমিকার গন্ধও তাঁর চরিত্র ও কার্যকলাপে পাওয়া যেতো না।
অপর দিকে সাবার রাণী ছিলেন আরবের ইতিহাসের বিপুল খ্যাতিমান ধনাঢ্য জাতির শাসক। কোনো মানুষকে অহংকারে মদমত্ত করার জন্য যেসব উপকরণের প্রয়োজন তা সবই তার ছিলো। যেসব জিনিসের জোরে কোনো মানুষ আত্মম্ভরী হতে পারে তা কুরাইশ নেতাদের তুলনায় হাজার লক্ষ গুণ বেশি তাঁর আয়ত্তাধীন ছিলো। তাছাড়া তিনি ছিলেন একটি মুশরিক জাতির অন্তরভুক্ত। পিতৃপুরুষের অনুসরণের জন্যও এবং জাতির মধ্যে নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত রাখার উদ্দেশ্যেও তাঁর পক্ষে শিরক ত্যাগ করে তওহিদের পথ অবলম্বন করা সাধারণ একজন মুশরিকের জন্য যতোটা কঠিন হতে পারে তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ছিলো। কিন্তু যখনই তাঁর সামনে সত্য সুস্পষ্ট হয়ে গেছে তখনই তিনি সত্যকে গ্রহণ করতে একটুও দ্বিধান্বিত হন নি। এ পথে কেউ বাধা দিয়ে তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে নি। কারণ তাঁর মধ্যে যে ভ্রষ্টতা ও বিভ্রান্তি ছিলো নিছক একটি মুশরিকি পরিবেশে চোখ মেলার ফলেই তা সৃষ্টি হয়েছিলো। প্রবৃত্তির উপাসনা ও কামনার দাসত্ব করার রোগ তাঁকে পেয়ে বসে নি। তাঁর বিবেক আল্লাহ্র সামনে জবাবদিহির অনুভূতিশূন্য ছিলো না।
সাবার রাণী যেহেতু মুশরিক ছিলেন সে কারণে হযরত সুলায়মান আ. তাকে তাঁর মুশরিকি আমল ছেড়ে দিয়ে মুসলিম তথা আল্লাহ্র একনিষ্ট বান্দা হওয়ার আহবান জানিয়ে পত্র দেওয়ার পরে তাঁর মধ্যে চেতনা ফিরে আসে। তিনি বুঝতে পারেন তিনি ভ্রষ্টতার মধ্যেই আছেন। ফলে তিনি তাঁর পূর্ববর্তী জীবনের কদাকার রীতি-নীতি, সংস্কৃতি, ধর্মকে বাক্স বন্দি করে হযরত সুলায়মান আ.-এর আহবানে আল্লাহ্র দীন (দীন ইসলাম) গ্রহণ করেন এবং মুসলিম হন।

মুসলিম কারা
প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, পৃথিবীতে মুসলিম বা মুসলমান বলতে কারা? ভূমিকাতে আলোচনার সূচনা করেছি যে, শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতেরাই কী শুধুমাত্র মুসলিম? উত্তরে স্পষ্ট করে বলতে হয় যে, শেষ নবীর উম্মতেরাই শুধু মুসলিম নয়। আদি পিতা হযরত আদম আ. ও মা হাওয়া আ. মুসলিম ছিলেন। আল্লাহ তা’আলা পৃথিবীতে যত নবী, রাসুল, পয়গাম্বর পাঠিয়েছেন তারা সবাই মুসলিম ছিলেন। তাদের উম্মতেরা মুসলিম ছিলেন। রাব্বুল আলামিন কুরআন করিমের একাধিক স্থানে মুসলিমের সংজ্ঞা নিয়ে এরশাদ করেছেন।
আমাদের জেনে রাখা দরকার যে, মুসলিম কোন পারিবারিক উপাধি নয়। বংশানুক্রমে মুসলমান পরিবারে জন্ম হলে, খতনা হলে, আর আরবি নাম রাখলেই কেউ মুসলমান হয় না। মুসলমানিত্ব এমন কোন বিষয় নয় যে, আমি মানি বা না মানি তা আমার সাথে লেপ্টে থাকবে। মুসলমানিত্ব ধারণ ও লালন-পালনের বিষয়।
যে ব্যক্তি আল্লাহ্র অনুগত হয়, আল্লাহ্কে নিজের মালিক, প্রভু ও মা’বুদ হিসেবে মেনে নেয়, নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহ্র হাতে সোপর্দ করে দেয় এবং দুনিয়ায় আল্লাহ্ প্রদত্ত জীবন বিধান অনুযায়ী জীবনযাপন করে সে-ই মুসলিম। এ আকীদা- বিশ্বাস ও কর্মপদ্ধতির নাম ‘ইসলাম’ মানব জাতির সৃষ্টিলগ্ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে দুনিয়ার মধ্যে যে সকল নবী-রসূল এসেছেন এটিই ছিলো তাঁদের সবার দীন ও জীবন বিধান।
কোন ব্যক্তি যদি মুসলিম হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে তাকে সর্বপ্রথম সমস্ত সৃষ্ট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সমস্ত কিছুর স্রষ্টা মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের দিকে মুখ ফিরাতে হবে। যেমনÑ আল্লাহ্ তা’আলা কুরআন করিমের সূরা আল আন‘আম-এর ৭৯ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন এভাবে, “আমি তো একনিষ্ঠভাবে নিজের মুখ সেই সত্তার দিকে ফিরিয়ে নিয়েছি যিনি যমীন ও আকাশসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং আমি কখনো মুশরিকদের অন্তরভুক্ত নই।”
এছাড়াও রাব্বুল আলামিন সুনির্দিষ্টভাবে কুরআন কারিমের সূরা আল বাক্বারাহ’র ১৩১ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন এভাবে, “তার অবস্থা এই ছিলো যে, তার রব যখন তাকে বললো, “মুসলিম (অনুগত) হয়ে যাও, “তখনই সে বললো, “আমি বিশ্ব-জাহানের প্রভুর ‘মুসলিম’, (অনুগত) হয়ে গেলাম।”
অন্যত্র সূরা আলে ইমরান-এর ৬৪ নম্বর আয়াতে রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেছেন এভাবে, “হে আহলি কিতাব! এসো এমন একটি কথার দিকে, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই ধরনের। তা হচ্ছে : আমরা আল্লাহ্ ছাড়া কারোর বন্দেগী ও দাসত্ব করবো না। তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবো না। আর আমাদের কেউ আল্লাহ্ ছাড়া আর কাউকেও নিজের রব হিসেবে গ্রহণ করবো না। যদি তারা এ দাওয়াত গ্রহণ করতে প্রস্তুত না হয়, তাহলে পরিষ্কার বলে দাও : তোমরা সাক্ষী থাকো, আমরা অবশ্যই মুসলিম (একমাত্র আল্লাহ্র বন্দেগী ও আনুগত্যকারী)।”
সূরা আল বাক্বারাহ’র ১৪০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানু তা’আলা এরশাদ করেছেন এভাবে,
“অথবা তোমরা কি একথা বলতে চাও যে, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়া’কূব ও ইয়া’কূব – সন্তানরা সবাই ইহুদি বা খৃষ্টান ছিলো?” বলো, “তোমরা বেশি জানো, না আল্লাহ?” যার যিম্মায় আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সাক্ষ্য বিদ্যমান রয়েছে এবং সে তা গোপন রাখে তার চেয়ে বড়ো জালেম আর কে হতে পারে? তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে আল্লাহ উদাসীন নন।”
এ প্রসঙ্গে বলা যায়, যেসব মূর্খ ইহুদি ও খৃস্টান জনতা যথার্থই মনে করতো, এ বড়ো বড়ো মহান নবীদের সকলেই ইহুদি বা খৃস্টান ছিলেন, তাদেরকে সম্বোধন করে ওপরের আয়াতটি নাযিল করা হয়েছে।
এখানে ইহুদি ও খৃস্টান আলেমদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। তারা নিজেরাও এ সত্যটি জানতো যে, ইহুদিবাদ ও খৃস্টবাদ সে সময় যে বৈশিষ্ট্য ও অবয়বসহ বিরাজ করছিলো তা অনেক পরবর্তীকালের সৃষ্টি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা সত্যকে একমাত্র তাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করছিলো। তারা জনগণকে ভুল ধারণা দিয়ে আসছিলো যে, নবীদের অতীত হয়ে যাবার দীর্ঘকাল পর তাদের ফকীহ, ন্যায়শাস্ত্রবিদ ও সূফীরা যে সমস্ত আকীদা- বিশ্বাস, পদ্ধতি, রীতি-নীতি ও ইজতিহাদী নিয়ম- কানুন রচনা করেছে, সেগুলোর অনুসরণের মধ্যেই মানুষের কল্যাণ ও মুক্তি নিহিত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট আলেমদেরকে জিজ্ঞেস করা হতো, তোমাদের একথাই যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে হযরত ইবরাহীম, ইসহাক, ইয়া’কূব আ. প্রমুখ নবীগণ তোমাদের এ সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে কোন সম্প্রদায়ের অন্তরভুক্ত ছিলেন? তারা এর জবাব এড়িয়ে যেতো। কারণ ঐ নবীগণ তাদের সম্প্রদায়ের অন্তরভুক্ত ছিলেন – নিজেদের জ্ঞান অনুযায়ী তারা একথা দাবি করতে পারতো না। কিন্তু নবীগণ ইহুদিও ছিলেন না এবং খৃস্টানও ছিলেন না, একথা যদি তারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দিতো তাহলে তো তাদের সব যুক্তিই শেষ হয়ে যেতো।
এ কারনেই কুরআন করিমের সূরা আলে ইমরান-এর ৬৭ নম্বর আয়াতে রাব্বুল আলামিন স্পষ্ট করে এরশাদ করেছেন এভাবে, “ইবরাহীম ইহুদী ছিল না, খৃষ্টানও ছিল না বরং সে তো ছিল একজন একনিষ্ঠ মুসলিম এবং সে কখনো মুশরিকদের অন্তরভুক্ত ছিল না।”
উপরের আলোচনা থেকে মুসলিম কারা এব্যাপারে আমরা স্পষ্ট একটি ধারণা পাই। আর সেই ধারণা হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ্র বন্দেগী ও আনুগত্যকারীরাই হচ্ছে মুসলিম।

ইসলামের অনুসারীদের নাম আল্লাহ্ মুসলিম রেখেছেন
প্রশ্ন আসতে পারে ইসলাম কী, ইসলামের অনুসারী কারা? বাংলা ভাষায় প্রচলিত অভিধান অনুযায়ী শেষ নবী হজরত মুহম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক প্রবর্তিত ধর্মই কী ‘ইসলাম’? প্রকৃত অর্থে শেষ নবী হজরত মুহম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক প্রবর্তিত ধর্ম ‘ইসলাম’ নয়। আদি পিতা হযরত আদম আ. ও আদি মাতা হাওয়া আ.-এর ধর্ম ছিলো ইসলাম। অর্থাৎ আল্লাহ্র ‘দীন’টাই হচ্ছে ইসলাম।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। আরবি ‘দীন’ শব্দের অর্থ জীবন পদ্ধতি ও জীবনবিধান। মানুষ দুনিয়ায় যে আইন ও নীতিমালার ভিত্তিতে তার সমগ্র চিন্তা, দর্শন ও কর্মনীতি গড়ে তোলে তাকে বলা হয় ‘দীন’। যারা আল্লাহ্র বেধে দেওয়া জীবন পদ্ধতি ও জীবনবিধান মেনে চলে তারাই ইসলামের অনুসারী। এই ‘দীন’ তথা ইসলামের অনুসারীরাই ‘মুসলিম’।
এ প্রসঙ্গে রাব্বুল আলামীন কুরআন করিমের সূরা আল বাক্বারাহ’র ১৩২ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন এভাবে,
“ঐ একই তরীকায় (পথে) চলার জন্য সে তার সন্তানদের উপদেশ দিয়েছিলো এবং একই উপদেশ দিয়েছিলো ইয়া‘কূবও তার সন্তানদেরকে। সে বলেছিলো, “আমার সন্তানেরা! আল্লাহ্ তোমাদের জন্য এ ‘দীন’টিই পছন্দ করেছেন। কাজেই মৃত্যুর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমরা মুসলিম থেকো।”
এখানে আমরা জানার চেষ্টা করি ইসলামের অনুসারী কারা? ইসলামকে ইবরাহীমের মিল্লাতের ন্যায়, নূহের মিল্লাত, মুসার মিল্লাত ও ঈসার মিল্লাত বলা যেতে পারে কিন্তু কুরআন করিম বার বার একে ইবরাহীমের মিল্লাত বলেছে। একই সাথে ইবরাহীমের তরীকার অনুসারী হওয়ার দাওয়াত দেয়া হয়েছে তিনটি কারণে। বিশেষ করে, এক. কুরআন করিমের বক্তব্যের প্রথম লক্ষ ছিলো আরবি ভাষাভাষী আরববাসী। আর তারা ইবরাহীমের সাথে যেভাবে পরিচিত ছিলো তেমনটি আর কারো সাথে ছিল না। তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আকীদা-বিশ্বাস যার ব্যক্তিত্বের প্রভাব সর্বব্যাপী ছিল তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহীম আ.। দুই. হযরত ইবরাহীমই এমন ব্যক্তি ছিলেন যার উন্নত চরিত্রের ব্যাপারে ইহুদী, খৃষ্টান, মুসলমান, আরবীয় মুশরিক ও মধ্যপ্রাচ্যের সাবেয়ী তথা নক্ষত্র পূজারীরা সবাই একমত ছিল। নবীদের মধ্যে দ্বিতীয় এমন কেউ ছিলেন না এবং নেই যার ব্যাপারে সবাই একমত হতে পারে। তিন. হযরত ইবরাহীম এসব মিল্লাতের জন্মের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছেন। ইহুদীবাদ, খৃষ্টবাদ ও সাবেয়ীবাদ সম্পর্কে তো সবাই জানে যে, এগুলো পরবর্তীকালে উদ্ভাবিত হয়েছে আর আরবিয় মুশরিকদের ব্যাপারে বলা যায়, তারা নিজেরাও একথা স্বীকার করতো যে, তাদের সমাজে মূর্তিপূজা শুরু হয় আমর ইবনে লুহাই থেকে। সে ছিল বনি কুযা’আর সরদার। মা’আব (মাওয়াব) এলাকা থেকে সে ‘হুবুল’ নামক মূর্তি নিয়ে এসেছিল। তার সময়টা ছিলো বড় জোর হযরত ঈসা আ.-এর পাঁচ থেকে ছ’শ বছর আগের। কাজেই এ মিল্লাতটিও হযরত ইবরাহীমের শত শত বছর পরে তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় কুরআন করিম যখন বলে এ মিল্লাতগুলোর পরিবর্তে ইবরাহীমের মিল্লাত গ্রহণ করো তখন সে আসলে এ সত্যটি জানিয়ে দেয় যে, যদি হযরত ইবরাহীম সত্য ও হিদায়তের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে থাকেন এবং মিল্লাতগুলোর মধ্য থেকে কোনোটিরই অনুসারী না থেকে থাকেন তাহলে নিশ্চিতভাবেই তাঁর মিল্লাতই প্রকৃত সত্য মিল্লাত। পরবর্তীকালের মিল্লাতগুলো সত্য নয়। আর হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মিল্লাতের দিকেই দাওয়াত দিচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে কুরআন করিমের সূরা আল বাক্বারাহ্-এর ১৩৫ নম্বর আয়াতে রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেছেন এভাবে, “ইহুদীরা বলে, “ইহুদী হয়ে যাও, তাহলে সঠিক পথ পেয়ে যাবে।” “খৃষ্টানরা বলে, খৃষ্টান হয়ে যাও, তাহলে হেদায়াত লাভ করতে পারবে।” ওদেরকে বলে দাও, “না, বরং এসব কিছু ছেড়ে দিয়ে একমাত্র ইবরাহীমের তরীকা (পথ বা নীতি) অবলম্বন করো। আর ইবরাহীম মুশরিকদের অন্তরভুক্ত ছিলো না।”
রাব্বুল আলামিন কুরআন করিমের সূরা আল হাজ্জ-এর ৭৮ নম্বর আয়াতে এ প্রসঙ্গে এরশাদ করেছেন এভাবে, “আল্লাহর পথে জিহাদ করো যেমন জিহাদ করলে তার হক আদায় হয়। তিনি নিজের কাজের জন্য তোমাদেরকে বাছাই করে নিয়েছেন এবং দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেন নি। তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাও। আল্লাহ্ আগেও তোমাদের নাম রেখেছিলেন “মুসলিম” এবং এর (কুরআন) মধ্যেও (তোমাদের নাম এটিই) যাতে রাসূল তোমাদের উপর সাক্ষী হন এবং তোমরা সাক্ষী হও লোকদের ওপর। কাজেই নামায কায়েম করো, যাকাত দাও এবং আল্লাহ্র সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাও। তিনি তোমাদের অভিভাবক, বড়ই ভালো অভিভাবক তিনি, বড়ই ভালো সাহায্যকারী তিনি।”
মানব ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকেই যারা তাওহিদ, আখেরাত, রিসালাত ও আসমানী কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী দলভুক্ত থেকেছে তাদের সবাইকেই উপরের আয়াতে সম্বোধন করা হয়েছে। এখানে মূল বক্তব্য হচ্ছে, এ সত্য মিল্লাতের অনুসারীদেরকে কোনোদিন “নূহী”, “ইবরাহিমী”, “মূসাভী” বা “মসীহী” ইত্যাদি বলা হয় নি বরং তাদের নাম “মুসলিম” (আল্লাহর ফরমানের অনুগত) ছিল এবং আজো তারা “মুহাম্মদী” নয় বরং মুসলিম। একথাটি না বুঝার কারণে লোকদের জন্য এ প্রশ্নটি একটি ধাঁধার সৃষ্টি করে রেখেছে যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসারীদেরকে কুরআন করিমের পূর্বে কোন্ কিতাবে মুসলিম নামে আখ্যায়িত করা হয়েছিলো?
সূরা আল বাকারাহ’র ১২৮ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন এভাবে, “হে প্রভু! আমাদের দু’জনকে তোমার মুসলিম (নির্দেশের অনুগত) বানিয়ে দাও। আমাদের বংশ থেকে এমন একটি জাতির উত্থান করো যে হবে তোমার মুসলিম (অনুগত)। তোমার ইবাদতের পদ্ধতি আমাদের বলে দাও এবং আমাদের ভুলচুক মাফ করে দাও। তুমি ক্ষমাশীল ও অনুগ্রহকারী।”

সকল নবীর অনুসারীর নাম ছিল মুসলিম
রাব্বুল আলামিন কুরআন করিমের সূরা আল হাজ্জ-এর ৭৮ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট করে বলেছেন, “…. তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাও। আল্লাহ্ আগেও তোমাদের নাম রেখেছিলেন “মুসলিম” এবং এর (কুরআন) মধ্যেও (তোমাদের নাম এটিই) যাতে রাসূল তোমাদের উপর সাক্ষী হন এবং তোমরা সাক্ষী হও লোকদের ওপর।”
মানব ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকেই যারা তাওহিদ, আখেরাত, রিসালাত ও আসমানী কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী দলভুক্ত থেকেছে তাদের সবাইকেই উপরের আয়াতে সম্বোধন করা হয়েছে ‘মুসলিম’ হিসেবে। এখানে মূল বক্তব্য হচ্ছে, এ সত্য মিল্লাতের অনুসারীদেরকে কোনোদিন “নূহী”, “ইবরাহিমী”, “মূসাভী” বা “মসীহী” ইত্যাদি বলা হয় নি বরং তাদের নাম “মুসলিম” (আল্লাহর ফরমানের অনুগত) ছিল এবং আজো তারা “মুহাম্মদী” নয় বরং মুসলিম।
কুরআন করিমের সুরা কাসাস-এর ৫৩ নম্বর আয়াতে রাব্বুল আলামিন ‘মুসলিম’ সম্পর্কে আরো স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। কুরআন করিমের ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ সুবহানু তা’আলা এরশাদ করেছেন এভাবে, “আর যখন তাদেরকে এটা শুনানো হয় তখন তারা বলে, “আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি, এটি যথার্থই সত্য আমাদের রবের পক্ষ থেকে, আমরা তো আগে থেকেই মুসলিম।”
সুরা কাসাস-এর বক্তব্য অনুযায়ী আগেও আমরা নবীদের ও আসমানী কিতাবের আনুগত্য করে এসেছি। তাই ইসলাম ছাড়া আমাদের জন্য কোনো দীন ছিলো না। আর এখন যে নবী আল্লাহ্র পক্ষ থেকে কিতাব এনেছেন তাকেও আমরা মেনে নিয়েছি। কাজেই মূলত আমাদের দীনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং আগেও যেমন আমরা ‘মুসলিম’ ছিলাম তেমনি এখনও ‘মুসলিম’ আছি।
একথা থেকে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দীনের দাওয়াত দিয়েছেন তার নামই ইসলাম নয় এবং ‘মুসলিম’ পরিভাষাটি শুধুমাত্র নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসারীগণ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়। বরং সব সময় এ ইসলামই ছিলো সকল নবীর দীন এবং সব জমানায় তাঁদের সবার অনুসারীগণ মুসলমানই ছিলেন। এ মুসলমানরা যদি কখনো পরবর্তীকালে আগত কোনো সত্য নবীকে মানতে অস্বীকার করে থাকে তাহলে কেবল তখনই তারা কাফের হয়ে গিয়ে থাকবে। কিন্তু যারা পূর্বের নবীকে মানতো এবং পরে আগত নবীকেও মেনে নিয়েছে তাদের ইসলামে কোনো ছেদ পড়ে নি। তারা পূর্বেও যেমন মুসলমান ছিলো, পরেও তেমনি মুসলমান থেকেছে।
আশ্চর্য, প্রবীন জ্ঞানীগুণী আলেমদের মধ্যেও কেউ কেউ এ সত্যটি অনুধাবন করতে অক্ষম হয়েছেন, এমনকি এ সুষ্পষ্ট আয়াতটি দেখেও তাঁরা নিশ্চিন্ত হন নি। আল্লামা সুয়ুতী ‘মুসলিম’ পরিভাষাটি কেবলমাত্র হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতের সাথেই বিশেষভাবে সম্পৃক্ত এ মর্মে বিস্তারিত আলোচনা সম্বলিত একটি বই লিখেছেন। তারপর যখন এ আয়াতটি সামনে এসেছে তখন নিজেই বলেছেন, “এখন তো আমার আক্কেল গুড়–ম হয়ে গেছে।” কিন্তু এরপর বলছেন, “আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম যে, এ ব্যাপারে আমার হৃদয় প্রসারিত করে দাও।” শেষে নিজের অভিমত প্রত্যাহার করার পরিবর্তে তিনি তার ওপরই জোর দিয়েছেন এবং এ আয়াতটির কয়েকটি ব্যাখ্যা পেশ করেছেন। এ ব্যাখ্যাগুলোর একটি অন্যটির চেয়ে বেশী ওজনহীন। যেমন, তাঁর একটি ব্যাখ্যা হচ্ছে, “আমরা কুরআন করিম আসার আগেই মুসলিম হয়ে যাবার সংকল্প পোষণ করতাম। কারণ আমাদের কিতাবসমূহ থেকে আমরা তাঁর আসার খবর পেয়ে গিয়েছিলাম এবং আমাদের সংকল্প ছিলো, তিনি আসলেই আমরা ইসলাম গ্রহণ করে নেবো। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হচ্ছে, “অর্থ্যাৎ আগে থেকেই আমরা কুরআন করিম মানতাম। কারণ আমরা তাঁর আগমনের আশা পোষণ করতাম এবং পূর্বাহ্নেই তাঁর নাযিল হবার পূর্বে যথার্থ সত্য বলে মেনে নেবার জন্যই আমরা মুসলিম ছিলাম। তৃতীয় ব্যাখ্যা হচ্ছে, আল্লাহর তাকদীরে পূর্বেই আমাদের জন্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিলাম যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কুরআনের আগমনে আমরা ইসলাম গ্রহণ করবো। তাই আসলে আমরা আগে থেকে মুসলিম ছিলাম। এই ব্যাখ্যাগুলোর কোনো একটি দেখেও আল্লাহ্ প্রদত্ত হৃদয়ের প্রশস্ততার কোনো প্রভাব সেখানে আছে বলে মনে হচ্ছে না।
প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, কুরআন করিম কেবলমাত্র এই একটি স্থানেই নয়, বরং অসংখ্য জায়গায় এ সত্যটি বর্ণনা করেছে। কুরআন করিম বলছে, আসল দীন হচ্ছে একমাত্র ‘ইসলাম’ (আল্লাহর আনুগত্য) এবং আল্লাহর বিশ্ব-জাহানে আল্লাহর সৃষ্টির জন্য এছাড়া দ্বিতীয় কোনো দীন বা ধর্ম হতে পারে না। সৃৃষ্টির প্রথম দিন থেকে যে নবীই মানুষকে পথনির্দেশ দেবার জন্য এসেছেন তিনি এ দীন নিয়েই এসেছেন। আর নবীগণ হামেশাই নিজেরা মুসলিম থেকেছেন, নিজেদের অনুসারীদেরকে মুসলিম হয়ে থাকার তাকিদ দিয়েছেন এবং তাঁদের যেসব অনুসারী নবুওয়াতের মাধ্যমে আগত আল্লাহ্র ফরমানের সামনে আনুগত্যের শির নত করে দিয়েছেন তারাও প্রতিটি যুগে মুসলিমই ছিলেন। এ প্রসঙ্গে দৃষ্টান্তস্বরূপ শুধুমাত্র গুটিকয় আয়াত এখানে উপস্থাপন করলাম।
“আসলে আল্লাহ্র কাছে ইসলামই একমাত্র দীন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৯)
“আর যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন অবলম্বন করে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না।”
হযরত নূহ আ. বলেন,
“তোমরা আমার উপদশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছো (এতে আমার কী ক্ষতি করেছো), আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই নি। আমার প্রতিদান তো আল্লাহ্র কাছে। আমাকে হুকুম দেয়া হয়েছে (কেই স্বীকার করুক বা না করুক) আমি যেনো মুসলিম হিসেবে থাকি।” (সূরা ইউনুস : ৭২)।
হযরত ইবরাহীম আ. এবং তাঁর সন্তানদের সম্পর্কে বলা হয় :
“যখন তার রব তাকে বললেন, মুসলিম (ফরমানের অনুগত) হয়ে যাও, সে বললো, আমি মুসলিম হয়ে গেলাম রাব্বুল আলামীনের জন্য। আর এ জিনিসটিরই ওসিয়াত করে ইবরাহীম তার সন্তানদেরকে এবং ইয়া‘কুবও : হে আমার সন্তানরা! আল্লাহ্ তোমাদের জন্য এ দীনটিই পছন্দ করেছেন। কাজেই মুসলিম না হয়ে তোমরা কখনো মৃত্যুবরণ করো না। তোমরা কি তখন উপস্থিত ছিলে যখন ইয়া‘কুবের মৃত্যুর সময় এসে গিয়েছিলো, যখন সে তার পুত্রদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলো, “আমার মৃত্যুর পর তোমরা কার ইবাদত করবে?” তারা জবাব দিয়েছিল, “আমরা ইবাদত করবো আপনার ইলাহ-এর এবং আপনার বাপ দাদা ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের ইলাহ-এর তাঁকে একক ইলাহ হিসেবে মেনে নিয়ে। আর আমরা তাঁরই অনুগত- মুসলিম।” (সূরা আল বাকারাহ : ১৩১-১৩৩)
“ইবরাহীম ইহুদী ছিলো না, খৃষ্টানও ছিলো না, বরং ছিলো একনিষ্ঠ মুসলিম।” (সূরা আলে ইমরান : ৬৭)।
স্বয়ং হযরত ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ. দোয়া করেন :
“হে আমাদের রব। আমাদেরকে তোমার মুসলিম (অনুগত) করো এবং আমাদের বংশ থেকে একটি উম্মত সৃষ্টি করো যে হবে তোমার মুসলিম।” (সূরা আল বাকারাহ : ১২৮)।
হযরত লূতের কাহিনীতে বলা হচ্ছে :
“আমরা লূতের জনপদের একটি বাড়ি ছাড়া মুসলমানদের আর কোনো বাড়ি পাইনি।” (সূরা আয যারিয়াত : ৩৬)।
হযরত ইউসুফ আ. মহিমান্বিত রবের দরবারে নিবেদন করেন :
“হে আমার রব! তুমি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দান করেছো এবং আমাকে কথার গভীরে প্রবেশ করা শিখিয়েছো। হে আকাশ ও পৃথিবীর ¯্রষ্টা! দুনিয়ায় ও আখেরাতে তুমিই আমার অভিভাবক। ইসলামের ওপর আমাকে মৃত্যু দান করো এবং পরিণামে আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের (মুসলিম) অন্তরভুক্ত করো।” (সূরা ইউসুফ : ১০১)।
হযরত মূসা আ. তাঁর নিজের জাতিকে বলেন :
“মুসা তার কওমকে বললো, “হে লোকেরা! যদি তোমরা সত্যি আল্লাহ্র প্রতি ঈমান এনে থাকো, তাহলে তাঁর ওপরই ভরসা করো, যদি তোমরা আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) হও।” (সূরা ইউনুস : ৮৪)।
বনী ইসরাঈলের আসল ধর্ম ইহুদীবাদ নয় বরং ইসলাম ছিলো। বন্ধু ও শত্রু সবাই একথা জানতো। কাজেই ফেরাউন সাগরে ডুবে যেতে যেতে যে শেষ কথাটি বলে তা হচ্ছে :
“আর আমি বনী ইসরাঈলকে সাগর পার করে নিয়ে গেলাম। আর ফেরাউন ও তার সেনাদল যুলুম-নির্যাতন ও সীমালংঘন করার উদ্দেশ্যে তাদের পেছনে চললো। অবশেষে যখন ফেরাউন ডুবতে থাকলো তখন বলে উঠলো, “আমি ঈমান আনলাম, বনী ইসরাঈল যার প্রতি ঈমান এনেছে তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং আমিও আনুগত্যের (মুসলিম) শির নতকারীদের অন্তরভুক্ত।” (সূরা ইউনুস : ৯০)।
বনী ইসরাঈলের সকল নবীর দীনও ছিলো এ ইসলাম :
“আমি তাওবাত নাযিল করেছি, যাতে ছিলো হেদায়াত ও আলো, সে অনুযায়ী সে নবীগণ যারা মুসলিম ছিল তাদের বিষয়াদির ফায়সালা করতো যারা ইহুদি হয়ে গিয়েছিলো।” (সূরা আল মায়েদাহ : ৪৪)।
এটিই ছিলো হযরত সুলায়মান আ. এর দীন। সেজন্য সাবার রাণী তাঁর প্রতি ঈমান আনতে গিয়ে বলছেন :
“আমি সুলায়মানের সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি অনুগত হয়ে গেলাম।” (সূরা আন নামল : ৪২)।
আর এটিই ছিল হযরত ঈসা আ. ও তাঁর হাওয়ারিদের (সহযোগী) দীন :
“আর যখন আমি হাওয়ারিদের কাছে ওহী পাঠালাম যে, ঈমান আনো আমার প্রতি এবং আমার রসূলের প্রতি, তখন তারা বললো, আমরা ঈমান এনেছি এবং সাক্ষী থাকো আমরা মুসলিম।” (সূরা আল মায়েদাহ : ১১১)
যদি সন্দেহ পোষণ করা হয় যে, আরবি ভাষার ‘ইসলাম’ ও ‘মুসলিম’ শব্দ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দেশে ও বিভিন্ন ভাষায় কেমন করে ব্যবহৃত হতে পারতো, তাহলে বলতে হয় যে, এটা নিছক একটা অজ্ঞতাপ্রসূত কথা। কারণ এ আরবি শব্দগুলো আসল বিবেচ্য নয়, আরবি ভাষায় এ শব্দগুলো যে অর্থে ব্যবহৃত হয় সেটিই মূল বিবেচ্য বিষয়। আসলে এ আয়াতগুলোতে যে কথাটি বলা হয়েছে তা হচ্ছে, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে যে প্রকৃত দীনটি এসেছে তা খৃষ্টবাদ, মূসাবাদ ও মুহাম্মদবাদ নয় বরং তা হচ্ছে নবীগণ ও আসমানী কিতাবসমূহের মাধ্যমে আগত আল্লাহ্র ফরমানের সামনে আনুগত্যের শির নত করে দেয়া এবং এ নীতি আল্লাহ্র যে বান্দা যেখানেই যে যুগেই অবলম্বন করেছে সে-ই হয়েছে একই বিশ্বজনীন, আদি ও চিরন্তন সত্যদীনের অনুসারী। যারা এ দীনকে যথার্থ সচেতনতা ও আন্তরিকতা সহকারে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য মুসার পরে ঈসাকে এবং ঈসার পরে হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- কে মেনে নেয়া ধর্ম পরিবর্তন করা হবে না, বরং হবে প্রকৃত ও আসল ধর্মের অনুসরণ করার স্বাভাবিক ও ন্যায়সংগত দাবি। পক্ষান্তরে যারা আম্বিয়া আ.-এর উম্মতের মধ্যে না জেনে- বুঝে ঢুকে পড়েছে অথবা তাঁদের দলে জন্ম নিয়েছে এবং জাতীয় ও বংশীয় স্বার্থপ্রীতি