নিজেদের দোষ জনগণের ওপর চাপাতেই কথিত লকডাউন

467

সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতাসিনদের ঘোষিত কথিত লকডাউন চলছে। কিন্তু সরকারের এমন অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত মানতে পারছেনা সাধারণ মানুষ। ফলে লকডাউনের মধ্যেও রাস্তায় যানবাহনের চাপ বেড়েছে। কোথাও কোথাও যানজট হচ্ছে। দ্রুত গতিতে বেড়ে চলছে করোনা রোগীর সংক্রমণ ও মৃত্যুর হারও।

জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে করোনা সংক্রমণ রোধ করার একমাত্র উপায় কি লকডাউন? নাকি সরকারের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও উদাসিনতা ঢাকতেই লকডাউন ঘোষণা করে সাধারণ মানুষের ওপর দোষ চাপানে হচ্ছে?

বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে একমাত্র মাধ্যম লকডাউন বা বিধি নিষেধ আরোপ করা নয়। বাংলাদেশের করোনার যে বিশাল বিস্তার তার জন্য দায় ক্ষমতাসীনদেরই নিতে হবে। সরকার যদি প্রথম থেকে উদাসিনতা না দেখিয়ে দ্বায়িত্ববান হতো তাহলে দেশের এই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।

দেখা গেছে, সৌদি আরব, ফ্রান্স, ব্রিটেন, ইতালিসহ বেশ কিছু দেশ বিধিনিষেধ একদম তুলে দেওয়ার কথা ভাবছে অথচ তাদের অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে ভয়াবহ ছিল। এখনও ব্রিটেনসহ বেশ কিছু দেশে সংক্রমণের হার বেশি থাকা সত্বেও সোশ্যাল ডিসট্যান্স মাস্ক ব্যবহারের বাধ্য বাধকতা তুলে দিতে যাচ্ছে কারণ তাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি আছে, হাসপাতালের বেড আছে, আইসিইউ বেড আছে, অক্সিজেন সাপ্লাই ভেন্টিলেটর সব প্রয়োজনীয় পরিমাণ আছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে যখন করোনা প্রবেশ করে যখন প্রস্তুতি নেয়ার দরকার তখন ক্ষমতাসীনরা করোনার চেয়ে শক্তিশালি দাবি করে কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে মুজিববর্ষের উৎসবও পালনে ব্যস্ত ছিলো। তারা দাবি করে আসছে ইউরোপ আমেরিকার থেকেও ভালো। অথচ আইসিইউ বেড , অক্সিজেন সাপ্লাই, ভেন্টিলেটর এবং ভ্যাক্সিনের ব্যবস্থা না করে দরিদ্র মানুষকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য ধ্বংসাত্মক লকডাউন চাপিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে অক্সিজেনের অভাবে ঠিকই গণহারে মারা যাচ্ছে মানুষ। যেটা মোটেও হওয়ার কথা ছিল না।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, দেশে করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ১০০টি হাসপাতালের মধ্যে ৫২টিতেই আইসিইউ সুবিধা নেই। এর মধ্যে ৩৫টি হাসপাতালই জেলা সদর হাসপাতাল। মোট আইসিইউর প্রায় ৭৫ শতাংশই ঢাকা বিভাগে, ২৫ শতাংশ বাকি সাত বিভাগে। জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা থাকলে মৃত্যু কমানো সম্ভব হতো বলে মনে করেন জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও চিকিৎসকেরা।

গত বছরে শেখ হাসিনা পক্ষ থেকে প্রতিটি জেলা হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট, ভেন্টিলেটর স্থাপন এবং উচ্চ মাত্রার অক্সিজেন সরবরাহব্যবস্থার নির্দেশ থাকলেও বাস্তবে কাজের কোন অগ্রগতি দেখা যায়নি। ১৩ মাসেও জেলা পর্যায়ে আইসিইউ ইউনিট তৈরি না হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের গাফিলতি ও পরিকল্পনার ঘাটতিকে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রের টাকা লুটপাট করে মুজিববর্ষ পালন করে এখন জনগণের উপর দোষ চাপিয়ে জনগণকে শাটডাউনের নামে গৃহবন্দী করে করোনা নিয়ন্ত্রণের হাস্যকর ও ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে সোচ্চার না হলে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া হলে জনগণ শুধু মরেই সাফ হয়ে যাবে।

দেখা গেছে, কয়েক দিন ধরে খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোতে মৃত্যু বেশি হচ্ছে। এ দুই বিভাগের ১৮ জেলার মধ্যে ১০টিতেই আইসিইউ সুবিধা নেই।

রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও জয়পুরহাট সদর হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নেই।

গত বছরের আগস্ট মাসে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দুই মাস আগে আইসিইউ ইউনিটে দুটি শয্যা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এসে পৌঁছালেও এখনো তা স্থাপন করা যায়নি।

নাটোর জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ না থাকায় জটিল রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। জেলা সদর হাসপাতালের সহকারী পরিচালক পরিতোষ কুমার রায় বলেন, আইসিইউর জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাচ্ছেন। কিন্তু সেখান থেকে বলা হচ্ছে এ মুহূর্তে তাঁদের হাতে আইসিইউ নেই। এ ছাড়া নাটোর সদর হাসপাতালে এখনো সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা চালু হয়নি। সেন্ট্রাল অক্সিজেন না থাকলে আইসিইউ চালানো যাবে না।

খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, নড়াইল ও মাগুরা সদর হাসপাতালে কোনো আইসিইউ শয্যা নেই।

এছাড়া সবচেয়ে কম আইসিইউ শয্যা ময়মনসিংহ বিভাগে। এই বিভাগের ময়মনসিংহ জেলায় ১৩টি এবং জামালপুর সদর হাসপাতালে ২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। নেত্রকোনা ও শেরপুর সদর হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা নেই।

সিলেট বিভাগে আইসিইউ শয্যা রয়েছে ২১টি। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ১৬টি ও মৌলভীবাজারে ৫টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতাল, দক্ষিণ সুরমা ও রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং খাদিমপাড়া ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নেই।

২৫০ শয্যার কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের অবস্থা আরো ভয়াবহ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এই হাসপাতালে চারটি আইসিইউ রয়েছে। কিন্তু হাসপাতাল–সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা থাকলেও আনুষঙ্গিক কোনো যন্ত্রপাতি নেই।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ বলা যাবে না। আইসিইউর বেশ কিছু যন্ত্রপাতি নেই। ভেন্টিলেটর পাওয়া যায়নি। ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জানানো হয়েছে, কিন্তু এখনো সরবরাহ করা হয়নি।’

সব জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ না হওয়াকে সম্পূর্ণভাবে স্বাস্থ্য বিভাগের গাফিলতি বলে মনে করেন করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক এই উপাচার্য বলেন, এই এক বছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কী কাজ করেছে? টাকার তো অভাব ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশই প্রতিপালিত হচ্ছে না। করোনা রোগীদের চিকিৎসার বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একেবারেই মনোযোগ দেয়নি।

লকডাউন না দিয়ে স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে প্রতিটি হাস পাতালে আইসিইউ সুবিধা থাকলে মৃত্যু কমানো সম্ভব হতো বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা। তারা বলছেন, করোনা ভাইরাস দেশে আক্রমনের শুরু থেকেই স্বাস্থ্য খাতের দিকে নজর না দিয়ে বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছে সরকার। করোনার তথ্য গোপন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় অপরিকল্পিত ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণকে জিম্মি করে রেখেছে। কথিত লকডাউন না দিয়ে যদি স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে জনগণের টিকা নিশ্চিত করতে পারে পাশাপাশি হাসপাতাল গুলোতে আইসিউইউ সুবিধা দিতে পারে তাহলে করোনা সংতক্রমণ ও মৃত্যুহার কমানো সম্ভব।