আমি কখনো ই নেতা ছিলাম না (পর্ব ৬) নিলোফার চৌধুরী মনি

385

আমি কখনো ই নেতা ছিলাম না (০৬) একটা সময় আমি ছাত্র দলের কর্মী ছিলাম। জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটি র তিন টার্ম বিভিন্ন ইউনিটে কাজ করেছি বহু গুলো বছর সততা ও নিষ্ঠার সাথে।
জীবনের হাসি খুশি, আনন্দ বেদনা, পাওয়া না পাওয়ার হিসেবে নিজেকে বলেছি- মণি এক জীবনে সব পাওয়া যায়না। নাইবা হলো সঠিক মূল্যায়ন।কোনো একদিন দেখো কড়ায় গন্ডায় ফেরত পাবে অথবা তোমার পরের প্রজন্ম তোমার ভাইবোনেরা,সন্তানেরা ঠিক তাদের ন্যায্য হিস্যা বুঝিয়ে নিবে। কিন্তু হায়!

তোমরা ও যে অভাগা। হিসেবে আমার থেকে কমতো নয়ই বরং বেশি। আজ দুদিন থেকে তোমাদের নিষ্ঠুরতার চরম ঘটে যাওয়া জীবনী পড়ে আমি ভীষণ ভাবে আহত।
কিছু ই ভালো লাগছে না। সেই সাথে রবিঠাকুর কানে কানে বলছেন – “যাহা চাইলাম তাহা পাইলাম না, আর যাহা পাইলাম তাহা ভুল করিয়া পাইলাম। “অথবা নাম না জানা কবির লাইন-” মন ভাঙা আর মসজিদ ভাঙা সমান কথা। “কিংবা সেই অর্থনীতিবিদ যদি আজ বেঁচে থাকতেন যিনি ডিমান্ড এর আবিস্কারক – ” সাধ আর সাধ্যের সামঞ্জস্য ই হচ্ছে চাহিদা। ” তিনি তার সংজ্ঞায় তেল মর্দন ও এক্সট্রা অর্থ এ দুটো শব্দ অবশ্য ই যোগ করতেন।

মনটা যখন ভীষণ বিধ্বস্ত,ভাবছি কি করলে -শান্তি কোথা পাবো!ঠিক তখনি মনে পড়লো উন্নত দেশের মানুষ জন শোক কাটানোর জন্য দ্বিগুণ পরিশ্রম করে।
আমি ও তেমনি কিছু একটা করি। কি করি, কি করি খুঁজে না পেয়ে হঠাৎ চোখে পড়লো কাঠ পলিশ এর কৌটা টা। যেই ভাবা সেই কাজ। সারাদিন দুই মেইড কে সাথে নিয়ে দুই সেট সোফা ও ডাইনিং সেট পলিশ করেই ফেললাম। ওরা সিরিস দিয়ে ঘষে ময়লা উঠালো আমি পলিশ করলাম।জীবনেও ভাবিনি আমি পারবো। সময়টা কাটলো ভালো এক্সপেরিমেন্ট দিয়ে। কষ্টটা ১০% কমলেও স্বস্তি পাচ্ছি না। সবশেষে ভাবলাম- ওদের জন্য অন্তত কিছু লিখা উচিত। আমি তো আর কিছু পারিনে সমব্যথি হওয়া ছাড়া।

আর আমার কপাল! সে তো পুড়াই। শরৎচন্দ্রের ভাষায় -“মরার আবার জাত কি?”পৃথিবীতে আমি আর কোনো দেশে যেমন শুনিন। চল্লিশ পঞ্চাশ বছরে ও ছাত্র রাজনীতি করে একসেপ্ট বাংলাদেশ। এবং বর্তমান সময়েও। আমরা বহু আগে থেকেই ডাকসু, চাকসু,রাকসু ইত্যাদি র ভিপি জিএস থেকে শুরু করে দলীয় ছাত্র নেতাদের দেখেছি একটা / দুটো/ তিনটে সাবজেক্টে মাস্টার্স করে শুধু ছাত্র সংসদে নির্বাচন করার জন্য কিংবা সংগঠন এর সভাপতি – সাধারণ সম্পাদক থাকার জন্য ।

আমরা এমনও দেখেছি ছাত্র সংগঠন এর সভাপতি / সাধারণ সম্পাদক থেকে জাতীয় নির্বাচন করে অকৃতকার্য হয়ে ফিরে এসে আবারও ছাত্র সংগঠন এর পূর্ব পদে ফিরে যাওয়া। হায় বিচিত্র সেলুকাস!!অথচ আমরা বেশ পূর্বে সময় দিয়ে ঘোষণা ছাড়া আমরা দেখলাম আমাদের সন্তান দের হঠাৎ বয়সসীমা নির্ধারিত পয়ত্রিশ এবং অবিবাহিত। আমার মতে পয়ত্রিশ ও বেশী।আঠাশ হলে ঠিক হতেই পারে। তবে ওদের আগে বুঝিয়ে যোগ্য জায়গায় বসিয়ে দিয়ে। আর দ্বিতীয়ত পয়ত্রিশ বছরে অবিবাহিত!

ওটা তো হয় না। প্লিজ সিনিয়র নেতারা বিনয়ের সাথে বলছি পয়ত্রিশ বছরে যে ছেলে বা মেয়ে প্রেম বিয়ে ছাড়া তাকে কি আদৌ ছেলে বা মেয়ে বলা যায়! কিংবা সংগঠনে আরো মিনিমাম তিন বছর অর্থাৎ আটত্রিশ বছরে” ও “কখন বিয়ে করবে, কখন বাচ্চা কাচ্চা মানুষ করবে? যদি আমরা সাম্যবাদের রাজনীতি করতাম তবে নাহয় বুঝতাম বিয়ের দরকার নাই – সন্তান রাষ্ট্রের। তখন নাহয় ওরা চষে বেড়াতো রাজনীতি সবার। আর আইন একেক জনের জন্য একেক রকম।এ কেমন অদ্ভুত নিয়ম!

প্রিয় সিনিয়র নেতৃবৃন্দ – দোহাই আপনাদের-ওদের হাহাকার তাকিয়ে দেখুন। ওদের কষ্টে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠছে। আপনারা আগ্নেয়গিরির উপর দাঁড়িয়ে আর কত অভিশাপ অর্জন করবেন?”নগরে আগুন লাগলে দেবালয় রক্ষা পায় না।”মূলদল সময় শেষ হবার পরও এক্সটেনশন,যুবদল সময় চলে যাবার পরও পাঁচ সদস্য, স্বেচ্ছাসেবক দল ও অনুরুপ, মহিলা দল সময় শেষের পর ফুল প্লেজেট,ছাত্রদল তিন মাস পর আংশিক কমিটি।
বয়োজ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ–এ যুগের ওদের সাথে আমাদের তফাৎ -কষ্ট আমাদের ও হতো,কিন্তু প্রকাশ ক্ষমতা ছিল সীমিত।আর ওরা এই ফেসবুক, টুইটার, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ এর যুগে এখন ওরা প্রত্যেকেই লেখক,সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার,নেতা। ওদের দেখানোর জন্য অনেক সময়োপযোগী প্রমাণ রাখে,রাখতে পারে।
ওরা মন ছুঁয়ে যাওয়া লিখতে পারে। ওরা অকপটে বলতে পারে —

এখন রাজনীতি নষ্ট ভ্রষ্ট দের।একটা কলেজে বারো বছর সম্রাজ্ঞী র মত রাজনীতির কাজ করেছি স্বৈরাচারী র রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে।কিন্তু কমিটি আমার ভাগ্যে আসেনি।
কতদিন আমি প্রত্যেক নামাজে দুই রাকাআত করে নফল পড়েছি কিন্তু কমিটি পাইনি।কত মধ্য রাত তাহাজ্জুদ পড়ে জায়নামাজ এ কেঁদেছি অথচ কমিটি অধরাই থেকেছে।

কত পীরের মাজার জিয়ারত করতে গেছি- সেই সিলেট থেকে চিটাগং কমিটি আমার নাগালের বাইরে ই বরাবরের মতোই।কত আত্মীয় রা হজ্জে গেলে বলে দিয়েছি আমার জন্য মক্কা ও মদিনা শরীফে দু রাকাআত নফল নামাজ পড়ে এসোতবু হতে পারিনি একটিবার কলেজ শাখার সভাপতি…। অথবা ছোট্ট সন্তান টিকে জড়িয়ে ধরে লিখেছে – তোকে অস্বীকার করতে পারলামনা বলেই আমি এত পরিশ্রম করেও হতে পারলাম না ছাত্র দলের নেতা। কারন তুই বড়ো হলে যে এই মিথ্যের জন্য আমি তোর চোখে নিচু হয়ে যেতাম রে মা।কিংবা এতদিন এত কষ্ট জেল জুলুম হুলিয়া নিয়েও আজ রিক্তহাতে ফিরে যেতে হচ্ছে নিরাভরণ মায়ের কাছে। কারণ একদিন নেতা হবো বলেই তো মায়ের হাত,কান,গলা খালি করেছি। বাপের হালের গরু টাও বেচলাম ক্রসফায়ার থেকে রক্ষা পেতে। আজ আমি রিক্ত। নেতারা বলেন তোমারে মিয়া মিছিল করতে কইছিল কে?এ জবাব আমার কাছে নেই।
আপনাদের কাছে???